ক্ষমতা পেয়ে জনগণকে বোকা ভাবার ভুল করবেন না
দ্যা সিটি সিগন্যাল ডেক্স
পুরোনো গল্প দিয়েই শুরু করি। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ শাসনামলের শেষ নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে মুসলিম লীগ ১১৯টি আসনের মধ্যে ১১৩টিতে জয় পেয়েছিল। গোটা উপমহাদেশে দলটি আর কোনো প্রদেশে পূর্ববঙ্গের মতো সাফল্য পায়নি। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর পূর্ববঙ্গের মানুষের মধ্যে ছিল বিপুল উচ্ছ্বাস।
দোমিনিক লাপিয়ের ও ল্যারি কলিন্সের ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, পাকিস্তান আন্দোলনের সাফল্যে পূর্ববঙ্গের মানুষের আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছিল বিশেষভাবে দৃশ্যমান। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র এক মাসের মাথায় ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা : বাংলা না উর্দু’ শিরোনামে পুস্তিকা প্রকাশ করে। শুরু হয় ভাষার অধিকার নিয়ে আন্দোলন।
এরপর ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক দল আওয়ামী মুসলিম লীগ। প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই দলটি জনসমর্থনের প্রমাণ দিতে শুরু করে। ১৯৪৯ সালের প্রথম উপনির্বাচনে দক্ষিণ টাঙ্গাইল আসনে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী প্রার্থী জমিদার খুররম খান পন্নী নবগঠিত দলের তরুণ সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকের কাছে পরাজিত হন। এর মধ্য দিয়ে মাত্র তিন বছর আগের বিপুল জনপ্রিয় মুসলিম লীগের জনভিত্তিতে ধস নামার প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ২৪ বছর পর রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশে ফেরার দিন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষ তাকে স্বাগত জানায়। সেই জনসমুদ্রের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমার নিজেরও স্মৃতি রয়েছে। মানুষের আবেগ, উচ্ছ্বাস ও ভালোবাসায় সেদিনের বাংলাদেশ যেন এক নতুন স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়েছিল।
কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হলো—জনপ্রিয়তা চিরস্থায়ী নয়। স্বাধীনতার পর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের রাজনৈতিক প্রকাশ ঘটতে শুরু করে। ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তী কয়েক বছরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পাল্টে যায়। তার শাসনামলের শেষ পর্যায়ে যে বিরাট জনসমর্থন ছিল, সেটি কীভাবে দ্রুত ক্ষয়ে গিয়েছিল—এই ইতিহাস আজও রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তার সম্পর্ক যে অত্যন্ত পরিবর্তনশীল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তার বহু দৃষ্টান্ত দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়েও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছিলেন। সে সময় তাকে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় রাখার দাবিও উঠেছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের সময় সেই সমর্থনের মাত্রা আগের অবস্থায় ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একই সঙ্গে পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমের একাংশে তার সরকার ও উপদেষ্টাদের নিয়ে তীব্র সমালোচনাও দেখা যায়।
এই পরিস্থিতি বর্তমান সরকারের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—ক্ষমতায় এসে তারা কি অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে? জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও দৈনন্দিন দুর্ভোগকে সরকার কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে? নির্বাচনে বড় জয় পাওয়া মানেই যে জনসমর্থন স্থায়ী হয়ে গেছে, বাংলাদেশের ইতিহাস বারবার তার বিপরীত শিক্ষা দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। সরকারের পক্ষ থেকে মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে আন্তর্জাতিক বাজার, প্রতিবেশী দেশে দামের পার্থক্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যয়ের মতো বিভিন্ন যুক্তি দেওয়া হয়েছে। লেখকের দৃষ্টিতে এসব যুক্তির কিছু অংশ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা এবং দেশের বাজারে মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ার মধ্যে সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থায়নের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন লেখক। তার মতে, একদিকে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে অন্যদিকে ভাতা বা কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ানোই সামাজিক নিরাপত্তার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও দলীয় নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য সাধারণ মানুষের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। ক্ষমতাসীনদের জন্য জনমতের সঙ্গে নীতির দূরত্ব তৈরি হওয়া দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতাও ক্ষমতাকে স্থায়ী করার নিশ্চয়তা দেয়নি। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা, ১৯৮২ সালে বিএনপির সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সময় সামরিক হস্তক্ষেপ, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক পালাবদল—সবই দেখিয়েছে, সংসদীয় শক্তি আর জনসমর্থন এক বিষয় নয়।
এমনকি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা সরকারও একসময় জনসমর্থন হারাতে পারে। তাই নির্বাচনী বিজয়কে জনগণের স্থায়ী সমর্থনের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ক্ষমতার প্রতিটি পর্যায়ে জনগণের জীবনযাত্রা, অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক অধিকার ও প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দেওয়াই টেকসই জনসমর্থনের ভিত্তি হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলোর একটি হলো—জনগণকে অবমূল্যায়ন করার পরিণতি কোনো সরকারের জন্যই ভালো হয়নি। ক্ষমতা সাময়িক; জনসমর্থন অর্জন ও ধরে রাখা একটি চলমান প্রক্রিয়া। তাই ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত অতীতের উত্থান-পতনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং জনগণের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে রাখা।
ক্ষমতা হাতে পেয়ে জনগণকে বোকা ভাবা তাই শুধু রাজনৈতিক ভুল নয়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিরও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাৎ
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ত্রিশিতা মওলাসহ একটি প্রতিনিধিদল। সাক্ষাৎকালে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ডিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে এ সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।সাক্ষাৎকালে জিএসএফ...
১২ মিনিট আগে
গোপন তদন্তের আওতায় পুলিশের ৬৫৩৯ পরিদর্শক
পুলিশের ৬ হাজার ৫৩৯ পরিদর্শকের বিষয়ে গোপন তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন কর্মকর্তার সাম্প্রতিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পর অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য ও আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের ওসি পদে পদায়নের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।এ জন্য পুলিশ সদর দপ্তরের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট শাখা...
১ ঘন্টা আগে
বিএনপি ক্ষমতায় এলে জনগণ ভালো থাকে: সুলতান সালাউদ্দিন টুকু
বিএনপি জনবান্ধব দল এবং দলটি ক্ষমতায় এলে জনগণ ভালো থাকে বলে মন্তব্য করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি বলেন, জনগণকে ভালো রাখার চেষ্টা করে বিএনপি।মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলা পরিষদ হলরুমে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, দেশের...
১২ ঘন্টা আগে
‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার কোনো সুযোগ নেই’: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার কোনো সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার ভার্চুয়ালি লন্ডনে কথা বলাকে সরকার ‘ওয়ার্থলেস অ্যাক্টিভিটিজ’ বা মূল্যহীন কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখছে।মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত কিম জি-জুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে
১৩ ঘন্টা আগে
