রাজনীতি

প্রশাসনে আনুগত্যের রাজনীতি ও দক্ষতার মূল্যায়ন বদলায়

অনলাইন ডেস্ক

১৫ ঘন্টা আগে


{news.title}

ছবি: সংগৃহীত


রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার পালাবদল হবে, নতুন নেতৃত্ব আসবে এবং নতুন নীতি নির্ধারিত হবে-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রায়ই দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের আচরণেও দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে আমলাতন্ত্রের একটি অংশে ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঘিরে আনুগত্যের দ্রুত রূপান্তর চোখে পড়ে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বহু আমলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। দায়িত্বে থাকাকালে তাদের সহযোগিতা, সৌজন্য ও আন্তরিকতা স্পষ্ট ছিল। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের পর অনেক সম্পর্কের চিত্র দ্রুত বদলে যেতে দেখা গেছে। যারা আগে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন বা বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ দেখাতেন, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তাদের অনেকেই যেন হঠাৎ দূরে সরে গেছেন।

এই অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত হলেও এর পেছনে একটি বৃহত্তর বাস্তবতা রয়েছে। প্রশাসনের একটি অংশ মনে করে, তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো ক্ষমতাসীনদের সন্তুষ্ট করা। ফলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন এমন একটি পেশাদার প্রশাসন, যারা ব্যক্তি নয়—রাষ্ট্র ও নীতির প্রতি অনুগত থাকবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা, হজ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় অনেক কর্মকর্তা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছেন। তবে একই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট হয়েছে যে প্রশাসনের একটি অংশ এখনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক মনোভাব থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি।

প্রশাসনে দলীয় বিবেচনার ঝুঁকি

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনে কিছু পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু যদি এসব সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সম্প্রতি কয়েকজন সচিবকে অব্যাহতি দেওয়া এবং কয়েকজনকে ওএসডি করার ঘটনা প্রশাসনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক সচিবকে ওএসডি করার বিষয়টি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তার দক্ষতা ও সততা নিয়ে প্রশাসনিক অঙ্গনে কোনো প্রশ্ন ছিল না। তবুও তাকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা প্রশাসনের ভেতরে একটি নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে।

যখন কর্মকর্তারা মনে করতে শুরু করেন যে পেশাগত দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক অবস্থানই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, তখন প্রশাসনের কর্মস্পৃহা কমে যায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণেও নিরপেক্ষতার বদলে নিরাপদ অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

পেশাদার প্রশাসনের প্রয়োজন

রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক নেতৃত্ব আসে ও যায়, কিন্তু প্রশাসনই রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। তাই কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন হওয়া উচিত দক্ষতা, সততা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে-রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়।

আমার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখে এবং কর্মকর্তাদের কাজ করার স্বাধীনতা দেয়, তখন তারা নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্মানের পরিবেশ তৈরি হলে প্রশাসন আরও কার্যকর হয়ে ওঠে।

মেধা ও সততার স্বীকৃতির গুরুত্ব

প্রশাসনে দক্ষতার মূল্যায়নের একটি ইতিবাচক উদাহরণও রয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে আমার সঙ্গে কাজ করা এক মেধাবী ও সৎ সচিব অবসরের সময় রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে নিয়োগ পান। তার সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রশাসনের ভেতরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তরুণ কর্মকর্তারা তখন বুঝতে পারেন যে নিষ্ঠা ও সততা শেষ পর্যন্ত মূল্যায়িত হয়। এতে প্রশাসনে দলীয় আনুগত্যের চেয়ে পেশাগত দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ে।

উপসংহার

রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি প্রশাসনে দলীয় আনুগত্য প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে, তবে তা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।

ক্ষমতা আসে এবং যায়, কিন্তু রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানগুলো স্থায়ী। তাই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে হলে এমন প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে যেখানে আনুগত্যের কেন্দ্র হবে নীতি, ন্যায় এবং জনগণের কল্যাণ-কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতার কেন্দ্র নয়।

বারিস্তা কফি,ফাস্ট ফুড এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রেনিং সেন্টার (বিএফএলটিসি)
Dr.Mahfuzul Alom