আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ কৌশল ও ইরান-নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

অনলাইন ডেস্ক

৪ ঘন্টা আগে


{news.title}

ছবি: সংগৃহীত


মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ ধারণা এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের কৌশল নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাত ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুধু তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ইস্যু নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনা।

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের মালিক বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু-এর মধ্যে যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে মতপার্থক্য সেই উত্তেজনাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ইরানের সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও ইসরাইল তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে।

‘বৃহত্তর ইসরাইল’-একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল

বিশ্লেষকদের মতে, ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য তিনটি-ভূখণ্ড সম্প্রসারণ, সামরিক আধিপত্য এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন থেকে শুরু করে গোলান মালভূমি ও দক্ষিণ লেবাননে সামরিক উপস্থিতি-সবকিছুই এই কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হয়।

ইসরাইল ইতোমধ্যে সিরিয়ার গোলান মালভূমিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং উত্তর ও দক্ষিণে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে দক্ষিণ লেবানন ও জর্ডান নদীর পূর্ব তীরেও তাদের আগ্রহ স্পষ্ট। এসব অঞ্চলের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব-বিশেষ করে পানি ও জ্বালানি সম্পদ-এই আগ্রহের অন্যতম কারণ।

সামরিক আধিপত্যের লক্ষ্য

শুধু ভূখণ্ড নয়, সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বাধীনতা অর্জনও এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসরাইল চায়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রয়োজনে সামরিক অভিযান চালানোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে। ইতোমধ্যে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় তাদের সামরিক কার্যক্রম এ লক্ষ্যকেই প্রতিফলিত করে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সামরিক স্থাপনা ব্যবহার, আরব দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং সম্ভাব্য নতুন ঘাঁটি স্থাপনের মাধ্যমে ইসরাইল তার সামরিক উপস্থিতি আরও বিস্তৃত করতে চাইছে।

প্রভাব বলয় গড়ে তোলার চেষ্টা

‘বৃহত্তর ইসরাইল’ কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক প্রভাব বলয় তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগানো হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ওপর মার্কিন সহায়তা ও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইসরাইলপন্থী নীতিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এর ফলে আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইসরাইলের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে।

বাধা হিসেবে ইরান

এই পুরো কৌশলের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে ইরানকে। গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়লেও ইরান এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের পাল্টা প্রতিরোধ এবং হরমুজ প্রণালিতে তাদের প্রভাব বজায় রাখা ইসরাইলের পরিকল্পনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহের পথ নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতা ইরানকে কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করে তুলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও সীমাবদ্ধতা

যদিও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের প্রধান মিত্র, তবুও সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরাইলবিরোধী মনোভাব কিছুটা বাড়ছে বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। এতে ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের নীতিতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের অনাগ্রহ বা সীমিত ভূমিকা ইসরাইলের কৌশল বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, অঞ্চলটি নতুন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী লক্ষ্য, ইরানের প্রতিরোধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তনশীল অবস্থান-সব মিলিয়ে আগামী সময় আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাত শুধু দুই-একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপরও পড়বে। ফলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকে নজর রাখছে পুরো বিশ্ব।

বারিস্তা কফি,ফাস্ট ফুড এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রেনিং সেন্টার (বিএফএলটিসি)
Dr.Mahfuzul Alom