বানিজ্য

কক্সবাজার উপকূলে ভরা মৌসুমেও মিলছে না বড় ইলিশ

অনলাইন ডেস্ক

৪ মাস আগে


{news.title}

বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার উপকূলে চলছে ইলিশের ভরা মৌসুম। কিন্তু জেলেদের জালে এবার তেমন ইলিশ মিলছে না। কিছু ট্রলারে যে ইলিশ ধরা পড়ছে, সেগুলোর আকারও ছোট—ওজন বড়জোর ৩০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম। গত ১০ বছরে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি বলে জানান ট্রলারমালিক ও জেলেরা। দূষণ, বৃষ্টি কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনসহ একাধিক কারণকে এর জন্য দায়ী করছেন গবেষকেরা। তবে এ নিয়ে এখনো বিশদ গবেষণা হয়নি।

গত বছরের তুলনায় উৎপাদন ও আকারে বড় পতন

গত বছরের এই সময়ে জেলেদের জালে গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ধরা পড়েছিল। এমনকি ২ হাজার ২০০ গ্রাম পর্যন্ত ইলিশও পাওয়া গিয়েছিল। অথচ এবার মাত্র ৩০০–৪৫০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশের দেখা মিলছে।

কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ছয় হাজার ট্রলার রয়েছে, যেগুলোতে কাজ করেন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার জেলে ও শ্রমিক। সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, “ছয়–সাত মাস ধরে সাগরে গিয়েও ইলিশের দেখা নেই। লঘুচাপ–নিম্নচাপের কারণে সাগরে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। শত শত ট্রলারমালিক লোকসানে পড়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে। এখন যে ছোট ইলিশ ধরা পড়ছে, তাও খুব কম।”

৫০টি পয়েন্টে কমছে ধরার পরিমাণ

মৎস্য বিভাগের তথ্য বলছে, কক্সবাজারের টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া ও কক্সবাজার সদরসহ অন্তত ৫০টি পয়েন্টে প্রতিদিন ৮–১০ মেট্রিক টন করে ইলিশ উঠছে। অথচ গত অক্টোবর–নভেম্বরে একই স্থানে দৈনিক গড় ছিল ২০ মেট্রিক টন।

গত অর্থবছরে কক্সবাজারে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৪০ হাজার ৪৪৮ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ৪২ হাজার টন। কিন্তু মৌসুমের শুরু থেকেই ছোট ইলিশ ধরা পড়ায় এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

গবেষকদের সতর্কতা

কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশরাফুল হক বলেন, “দেশের সব উপকূলে এখন ছোট আকারের ইলিশ ধরা পড়ছে। আগে এমনটা দেখা যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কি না, এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলছে।”

ঘাটে ফিরছে ট্রলার, ইলিশ কম–দামে বেশি

মঙ্গলবার সকালে নুনিয়াছটা ফিশারি ঘাটে দেখা যায়, ১৫–২০টি ট্রলার সাগর থেকে ফিরে ভিড়েছে। এর মধ্যে মাত্র সাতটি ট্রলারের জালে ২০০ থেকে ৭০০টি ইলিশ ধরা পড়েছে। বেশির ভাগেরই ওজন ৩৫০–৪০০ গ্রাম।

একটি ট্রলার (এফবি কাউসার) ৬০০টি ইলিশ ধরে পেয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা। ট্রলারের জেলে আবুল কালাম বলেন, “আমরা ৭ দিন সাগরে ছিলাম, ৫০–৬০ কিলোমিটার দূরে গিয়েছি, ১০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে জাল ফেলেছি—তারপরও ৬০০টি ইলিশ পেয়েছি, সেগুলোর বেশির ভাগই ছোট। গত বছর একই জায়গায় ২০ হাজারের বেশি বড় ইলিশ ধরেছিলাম।”

ঘাটে দেখা যায়, ৯০ শতাংশ ইলিশের ওজন ৩৫০–৪৫০ গ্রাম। পাইকারিতে এগুলোর দাম কেজিতে ৯০০ থেকে ১,২০০ টাকা। খুচরায় দাম বাড়ছে আরও ২০০–৩০০ টাকা।

কক্সবাজার থেকে ঢাকায় প্রতিদিন যেখানে ৩০ মেট্রিক টন ইলিশ পাঠানো হতো, সেখানে বর্তমানে যাচ্ছে ২–৩ মেট্রিক টন।

বৃষ্টির ঘাটতি ও দূষণকে প্রধান কারণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশ ছোট হওয়ার মূল কারণ দুটি—
১. নদী ও সাগরে দূষণ ও অক্সিজেনের ঘাটতি
২. পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়া

এ কারণে ইলিশের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।

ইলিশ বিক্রি কমেছে ৯৫ মেট্রিক টন

মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরের প্রথম ৯ দিনে বিক্রি হয়েছে ৯৪.১১ মেট্রিক টন ইলিশ।
অক্টোবরে বিক্রি হয়েছিল ২১০ মেট্রিক টন—যা গত বছরের অক্টোবরে ছিল ৩০৫ মেট্রিক টন। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এবারের অক্টোবরেই বিক্রি কমেছে ৯৫ মেট্রিক টন

মৎস্য বিভাগও উদ্বিগ্ন

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, “২৫ অক্টোবর নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর জেলেরা সাগরে নেমেছেন। প্রথম দিকে কিছু ইলিশ মিললেও এখন পরিমাণ খুবই কম, আকারও ছোট। দূষণ, বৃষ্টি না হওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থাকতে পারে। এ নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।”

বারিস্তা কফি,ফাস্ট ফুড এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রেনিং সেন্টার (বিএফএলটিসি)
Dr.Mahfuzul Alom