কৈশোরের আকর্ষণ, সম্পর্ক ও ‘না’ শুনতে শেখার জরুরি শিক্ষা
লেখিকা : নুরুন্নাহার সাথী
কৈশোর মানুষের জীবনের এমন এক সংবেদনশীল অধ্যায়, যেখানে আবেগের জন্ম যেমন দ্রুত হয়, তেমনি তার দিকনির্দেশনাও অনেক সময় অনিশ্চিত থাকে। এই বয়সে একটি দৃষ্টি, একটি হাসি, একটি উপস্থিতি কিংবা সামান্য মনোযোগও গভীর আলোড়ন তুলতে পারে। মানুষের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সাধারণত বাহ্যিক অবয়ব ও অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য—এই দুই স্তরে কাজ করলেও কৈশোরে অধিকাংশ আকর্ষণের শুরু হয় বাহ্যিক মুগ্ধতা থেকে। কিন্তু সেই ভালো লাগা সবসময় একই পরিণতির দিকে যায় না। কারও ক্ষেত্রে তা আত্মোন্নয়নের শক্তি হয়ে ওঠে, কারও ক্ষেত্রে তা অবসেশন, নিয়ন্ত্রণের বাসনা কিংবা সহিংসতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই কৈশোরের সম্পর্ক ও আকর্ষণকে কেবল ‘বয়সের দোষ’ বলে উড়িয়ে না দিয়ে এর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক দিকটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
কৈশোরের আকর্ষণকে বিশ্লেষণ করলে মোটামুটি তিনটি প্রবণতা চোখে পড়ে। প্রথমটি হলো এমন এক ধরনের অনুরাগ, যা ইতিবাচক অনুভূতি থেকে ইতিবাচক আচরণে রূপ নেয়। এই স্তরে ভালো লাগা একজন কিশোর বা কিশোরীকে ভেঙে না দিয়ে বরং একজন উন্নততর মানুষ হয়ে উঠতে প্রেরণা দেয়। শুরুতে হয়তো বাহ্যিক মুগ্ধতা থাকে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তা অপর পক্ষের ব্যক্তিত্ব, গুণাবলি ও মানসিক সৌন্দর্যের প্রতি শ্রদ্ধায় পরিণত হয়। পছন্দের মানুষের চোখে নিজের একটি ভালো পরিচয় তৈরি করতে তারা পড়াশোনা, আত্মশৃঙ্খলা, আচার-ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ গঠনে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের অনুভূতি প্রকাশের পর যদি প্রত্যাখ্যাত হতে হয়, তারা তা মেনে নেওয়ার মানসিকতা দেখায়। কোনো প্রতিহিংসা নয়, কোনো অপপ্রচার নয়—বরং আত্মসম্মান বজায় রেখে জীবনকে ইতিবাচক ধারায় এগিয়ে নেওয়ার শক্তিই এখানে মুখ্য হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় প্রবণতাটি আরও জটিল। এখানে অনুভূতি হয়তো শুরুতে সত্যিকারের ভালো লাগা থেকেই জন্ম নেয়, কিন্তু তার প্রকাশ ঘটে নেতিবাচক আচরণের মাধ্যমে। কৈশোরের অপরিপক্বতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা, আত্মপরিচয়ের সংকট এবং প্রত্যাখ্যান সামলানোর অক্ষমতা অনেক সময় ভালো লাগাকে উগ্র অধিকারবোধে পরিণত করে। তখন ভালোবাসা আর নির্মল থাকে না; তা ধীরে ধীরে অবসেশনে রূপ নেয়। দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কেউ কেউ অযাচিত যোগাযোগ, অনাকাঙ্ক্ষিত নজরদারি, পথ আগলে দাঁড়ানো কিংবা ক্রমাগত বিরক্ত করার মতো আচরণে জড়িয়ে পড়ে। সমস্যাটি অনুভূতিতে নয়, বরং অনুভূতির অস্বাস্থ্যকর প্রকাশে। এই মানসিকতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি দেখা যায় প্রত্যাখ্যানের পর। ‘না’ মেনে নিতে না পেরে কেউ কেউ ব্ল্যাকমেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্তা, অপপ্রচার কিংবা আত্মঘাতী হুমকির মতো বিপজ্জনক পথে চলে যায়। তখন একটি কিশোর মন শুধু অন্যের জন্যই নয়, নিজের জন্যও ধ্বংসের কারণ হয়ে ওঠে।
তৃতীয় প্রবণতাটি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। এখানে সম্পর্কের ভাষা ব্যবহার করা হলেও ভেতরে প্রকৃত অনুরাগের উপস্থিতি খুবই ক্ষীণ, কখনও অনুপস্থিত। কাজ করে সাময়িক মোহ, আহত অহংবোধ, ক্ষমতা প্রদর্শনের বাসনা কিংবা কাউকে নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা। বন্ধুমহলে নিজেকে ‘হিরো’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, কাউকে একটি ‘অর্জন’ বা ‘বস্তু’ হিসেবে দেখা, কিংবা প্রত্যাখ্যানকে ব্যক্তিগত অপমান মনে করে প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা—এসব থেকেই এমন আচরণের জন্ম হয়। এ ধরনের মানসিকতায় শুরু থেকেই বুলিং, হুমকি, অপমান, চরিত্রহনন, প্রযুক্তির অপব্যবহার, গুজব ছড়ানো, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে দেওয়া বা সামাজিকভাবে হেয় করার প্রবণতা দেখা যায়। চরম পর্যায়ে তা শারীরিক সহিংসতা বা গ্যাং সংস্কৃতির দিকেও গড়াতে পারে। এখানে সম্পর্ক নয়, বরং মানুষকে ভেঙে ফেলার এক নির্মম মানসিকতা কাজ করে।
এই বাস্তবতা সামনে রেখে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—আমরা কি কৈশোরের আবেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে শিখেছি? আমাদের পরিবার ও সমাজে এখনও একটি প্রবণতা রয়েছে, যেখানে কিশোর-কিশোরীদের আকর্ষণ, আবেগ, সম্পর্ক বা প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতাকে তুচ্ছ করে দেখা হয়। কখনও তা ‘বয়সের দোষ’, কখনও ‘অসভ্যতা’, কখনও ‘ভুল পথে যাওয়া’—এই লেবেলে আটকে দেওয়া হয়। কিন্তু এভাবে সমস্যাকে আড়াল করা যায়, সমাধান করা যায় না। কারণ বয়ঃসন্ধিকালের এই আবেগই পরবর্তী জীবনে সম্পর্কবোধ, আত্মসম্মান, ব্যক্তিগত সীমারেখা এবং অন্যের স্বাধীনতাকে সম্মান করার মানসিকতার ভিত তৈরি করে।
এখানে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অত্যন্ত বড়। কিশোর-কিশোরীদের শুধু ভালোবাসা বা সম্পর্কের অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন করলেই হবে না; তাদের শেখাতে হবে সম্মতি, সীমারেখা, প্রত্যাখ্যান এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ভাষা। ‘না’ শোনা জীবনের স্বাভাবিক অংশ—এ শিক্ষা পরিবারে যেমন প্রয়োজন, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধ শিক্ষাতেও তা জরুরি। সন্তানকে শুধু সফল হওয়ার শিক্ষা দিলে হবে না; তাকে সংযমী, সহনশীল ও সম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে, যেখানে একটি সম্পর্ক ভাঙনের প্রতিক্রিয়া কয়েক মিনিটের মধ্যে অনলাইন হেনস্তা, গুজব বা মানসিক নির্যাতনে রূপ নিতে পারে, সেখানে এই শিক্ষা আরও বেশি অপরিহার্য।
আমাদের সামাজিক আলাপেও পরিবর্তন আনা দরকার। কৈশোরের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলাকে ট্যাবু বানিয়ে রাখলে কিশোররা উত্তর খুঁজবে অন্যত্র—অনির্ভরযোগ্য বন্ধুসমাজে, আংশিক তথ্যভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, কিংবা এমন সাংস্কৃতিক উপস্থাপনায় যেখানে জোরজবরদস্তি, অবসেশন বা অধিকারবোধকে কখনও কখনও প্রেমের অংশ হিসেবে দেখানো হয়। অথচ তাদের প্রয়োজন নিরাপদ আলাপের পরিসর, যেখানে তারা বিচার নয়, দিকনির্দেশনা পাবে; ভয় নয়, বোঝাপড়া পাবে। পরিবার, শিক্ষক, পরামর্শদাতা এবং সমাজ—সবাইকে এই জায়গায় আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
ভালোবাসা, আকর্ষণ বা সম্পর্ক—এসব মানবজীবনের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা কীভাবে একজন মানুষকে গড়ে তুলবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে সে কতটা শিখেছে সম্মান করতে, সংযত থাকতে এবং প্রত্যাখ্যানকে পরিণতভাবে গ্রহণ করতে। তাই কৈশোরের আকর্ষণকে ভয় পাওয়ার বিষয় হিসেবে নয়, বরং সঠিক শিক্ষা, মানসিক সহায়তা ও মূল্যবোধের আলোয় পরিচালিত করার বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। কারণ ভালোবাসা কখনও কাউকে ভাঙার নাম নয়; সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষকে আরও মানবিক করে তোলার নাম।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৯ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
“বিদ্রোহী কবির প্রস্থান, চিরকালীন প্রেরণার আলো”বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৭৬ সালের ২৭ আগস্ট তিনি পরলোকগমন করেন। বিদ্রোহী কবি, গানের স্রষ্টা, অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনন্য প্রতীক হিসেবে তিনি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তার প্রয়াণ দিবসে রাজধানীসহ সারাদেশে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে স্মরণ করা হচ্ছে...
১০ মাস আগে
গুলশানে কবি আল মাহমুদ পাঠাগার উদ্বোধন
ডিএনসিসি’র উদ্যোগে বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা।বাংলা সাহিত্যের অমর কবি মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদের স্মৃতিকে চিরজাগরুক রাখতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) গড়ে তুলেছে “কবি আল মাহমুদ পাঠাগার”। মঙ্গলবার গুলশানের শহিদ তাজউদ্দীন আহমদ পার্কে নবনির্মিত এ পাঠাগারের উদ্বোধন করেন ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ।অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিএনসিসি প্রশাসক...
১০ মাস আগে
