জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন: ইবাদত,ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির মহিমান্বিত সময়
ধর্ম ডেস্ক:
মুসলিম উম্মাহর জন্য পবিত্র জিলহজ্জ মাস অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও ফজিলতময় একটি মাস। বিশেষ করে এ মাসের প্রথম দশ দিনকে ইসলামে বছরের শ্রেষ্ঠ দিনসমূহ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কুরআনুল কারিম ও সহিহ হাদিসে এ সময়ের আমল, ইবাদত, রোজা, জিকির, দান-সদকা ও কুরবানির গুরুত্ব অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, এই দিনগুলো বান্দার আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ।
কুরআন ও হাদিসে জিলহজ্জের প্রথম দশ দিনের মর্যাদা
পবিত্র কুরআনল এর সূরা আল-ফজরের শুরুতেই মহান আল্লাহ বলেন—
“শপথ ফজরের, শপথ দশ রাতের।”
তাফসিরকারকদের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে ইবনে আব্বাস (রা.), ইবনুয যুবাইর, মুজাহিদ ও ইবনে কাসীর (রহ.)-এর মতে, এখানে ‘দশ রাত’ বলতে জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনকে বোঝানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সহীহ আল বুখারী-তে বর্ণিত এক হাদিসে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেছেন—
“জিলহজ্জের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো আমল নেই।”
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করেন, “আল্লাহর পথে জিহাদও নয়?” জবাবে রাসুল (সা.) বলেন—
“জিহাদও নয়, তবে সেই ব্যক্তি ছাড়া, যে নিজের জান-মাল নিয়ে বের হয়ে আর কিছুই নিয়ে ফিরে আসেনি।”
ইসলামী গবেষকরা বলেন, এই হাদিস প্রমাণ করে যে জিলহজ্জের প্রথম দশ দিনের ইবাদত, জিকির, রোজা ও নেক আমলের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ।
আরাফার দিনের রোজার ফজিলত
সহীহ মুসলিম-এ আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“আরাফাতের দিনের রোজা বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের গোনাহের কাফফারা হয়ে যায়।”
তাই হজে না থাকা মুসলমানদের জন্য ৯ জিলহজ্জ তথা আরাফার দিনের রোজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত হিসেবে বিবেচিত।
রাসুল (সা.)-এর নিয়মিত আমল
উম্মে হাফসা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী মুহাম্মদ (সাঃ) চারটি আমল কখনো ত্যাগ করতেন না—
আশুরার রোজা,
জিলহজ্জের প্রথম নয় দিনের রোজা,
প্রতি মাসে তিন দিনের রোজা,
ফজরের দুই রাকাত সুন্নত।
হাদিসটি সুনানে আন-নাসায়ি: এ বর্ণিত হয়েছে।
দিনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিন
ইসলামী স্কলার ও আলেমদের মতে, বছরের দিনগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হলো জিলহজ্জের প্রথম দশ দিন। অন্যদিকে রাতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ রাত হলো রমজানের শেষ দশ রাত। তাই এই সময়কে ইবাদতের মৌসুম বলা হয়।
কিছু হাদিসে এসেছে, এ দশকের প্রতিটি দিনের রোজা এক বছরের রোজার সমতুল্য এবং প্রতিটি রাতের ইবাদত শবে কদরের ইবাদতের সমান সওয়াবের কারণ হতে পারে। তবে মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন, এ সংক্রান্ত কিছু বর্ণনার সনদে দুর্বলতা আছে।
তাকবীরে তাশরীক পাঠের গুরুত্ব
জিলহজ্জ মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা। ইসলামী শরিয়তের বিধান মতে, ৯ জিলহজ্জ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ্জ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর অন্তত একবার তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব। তিনবার পড়া মুস্তাহাব।
তাকবীরে তাশরীক হলো—
“আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।”
এছাড়া ১ থেকে ১৩ জিলহজ্জ পর্যন্ত চলাফেরা, বাজার, রাস্তা ও জনসমাগমস্থলে বেশি বেশি তাকবীর পাঠ করা সুন্নত। পুরুষরা উচ্চস্বরে এবং নারীরা নিম্নস্বরে তাকবীর বলবেন।
কুরবানিদাতার জন্য বিশেষ নির্দেশনা
হাদিসে এসেছে, যারা কুরবানি করার নিয়ত করেন, তাদের জন্য জিলহজ্জের চাঁদ ওঠার পর কুরবানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত চুল ও নখ না কাটার নির্দেশ রয়েছে। এ বিষয়ে সুনানে আন- নাসায়ি-সহ বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে বর্ণনা পাওয়া যায়।
এই দশ দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমলসমূহ
ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, জিলহজ্জের প্রথম দশ দিন একজন মুমিনের জন্য আমলের সুবর্ণ সুযোগ। এ সময় যেসব আমল বেশি বেশি করা উচিত—
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করা।
নফল নামাজ বৃদ্ধি করা।
বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা।
জিকির, দোয়া ও ইস্তিগফার করা।
১ থেকে ৯ জিলহজ্জ পর্যন্ত রোজা রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।
বিশেষ করে আরাফার দিনের রোজা রাখা।
বেশি করে দান-সদকা করা।
অসহায় ও দরিদ্র মানুষের খোঁজখবর নেওয়া।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা।
মহান আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্টির জন্য কুরবানির প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
হজ ও ওমরাহ আদায় করা (সামর্থ্যবানদের জন্য)।
কুরবানির গুরুত্ব ও বিধান
কুরবানি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলোর একটি। সুনানে ইননে মাজাহ-এ আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“যার সামর্থ্য রয়েছে অথচ সে কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।”
এই হাদিসের ভিত্তিতে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কুরবানিকে ওয়াজিব বলেছেন। তবে অন্যান্য ইমামদের মতে, এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা।
যেসব পশু কুরবানির উপযুক্ত নয়:
হাদিস অনুযায়ী চার ধরনের পশু কুরবানির জন্য অযোগ্য—
১. স্পষ্ট অন্ধ পশু,
২. স্পষ্ট রোগাক্রান্ত পশু,
৩. খোঁড়া বা চলতে অক্ষম পশু,
৪. অতিরিক্ত দুর্বল ও শীর্ণ পশু।
এ বিষয়ে জামে আত তিরমিজি , সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে আন নাসায়ি এ বর্ণনা রয়েছে।
ঈদগাহে কুরবানি করা সুন্নত:
ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী মুহাম্মাদ (সাঃ) ঈদের মাঠে কুরবানির পশু জবাই করতেন। তাই সম্ভব হলে ঈদগাহে কুরবানি করা সুন্নত। তবে প্রয়োজনে অন্য স্থানেও কুরবানি করা বৈধ।
একইভাবে নিজ হাতে কুরবানির পশু জবাই করা উত্তম ও সুন্নত। তবে অন্য কাউকে দিয়েও জবাই করানো ও জায়েজ।
আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার শিক্ষা
ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, জিলহজ্জের প্রথম দশ দিন কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতের সময় নয়; এটি ত্যাগ, তাকওয়া, মানবিকতা ও আল্লাহভীতির শিক্ষা গ্রহণের সময়। কুরবানির মাধ্যমে মানুষ আত্মত্যাগের শিক্ষা লাভ করে এবং সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সঙ্গে সম্পদ ভাগাভাগির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তারা বলেন, বর্তমান ভোগবাদী সমাজে জিলহজ্জের শিক্ষা মানুষকে আত্মসংযম, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং মানবকল্যাণে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। মুসলমানদের উচিত এ সময়কে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে বেশি বেশি নেক আমলে আত্মনিয়োগ করা।
