আন্তর্জাতিক

এপস্টেইন ইস্যু পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এগোনোর আহ্বান ট্রাম্পের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২ মাস আগে


{news.title}

ছবি: সংগৃহীত


গত দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ কুখ্যাত ধনকুবের জেফ্রি এপস্টেইনকে ঘিরে যৌন পাচার-সংক্রান্ত তদন্তের লাখ লাখ নথি প্রকাশ করেছে। এসব নথি প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশকে ‘এই অধ্যায় পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার’ আহ্বান জানালেও বাস্তবে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে আরও গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ জানিয়েছেন, কংগ্রেসে গত নভেম্বর পাস হওয়া একটি আইনের আওতায় বাধ্যতামূলকভাবে শুরু হওয়া এপস্টেইন–সংক্রান্ত সরকারি নথি পর্যালোচনা শেষ হয়েছে। বিচার বিভাগের দাবি, এই পর্যালোচনায় নতুন করে কাউকে অভিযুক্ত করার মতো কোনো আইনি ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

রোববার দেওয়া এক বক্তব্যে ব্ল্যাঞ্চ বলেন,
‘নথিগুলোতে বিপুল পরিমাণ চিঠিপত্র, ইমেইল ও ছবি রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই কাউকে অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করার মতো প্রমাণ হাজির করে না।’

তবে বিচার বিভাগের আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা শেষ হলেও ক্যাপিটল হিলে বিতর্ক থেমে নেই। প্রতিনিধি পরিষদ এখনো এপস্টেইন-সংক্রান্ত তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হয়েছে। রিপাবলিকানদের পক্ষ থেকে কংগ্রেস অবমাননার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর তারা সাক্ষ্য দিতে সম্মত হন।

একই সঙ্গে কংগ্রেসের একাধিক সদস্য ও এপস্টেইনের ভুক্তভোগীরা দাবি করছেন, আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি এখনো প্রকাশ করা হয়নি এবং সেগুলো জনসমক্ষে আনা প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপট আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ যারা স্পষ্টভাবে এই অধ্যায় থেকে সরে যেতে চান, তাদের জন্য এপস্টেইন-সংক্রান্ত বিতর্ক পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলা কতটা কঠিন হয়ে উঠেছে।

আপাতদৃষ্টিতে এই বিতর্ক থেকে বড় কোনো রাজনৈতিক ক্ষতি ছাড়াই বেরিয়ে এসেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে এপস্টেইনের সঙ্গে যাদের সম্পর্কের তথ্য নথিতে ঘন ঘন উঠে এসেছে এবং যারা ২০০৮ সালে এপস্টেইন দণ্ডিত যৌন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও তার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন-সেসব প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি ভিন্ন।

এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন যুক্তরাজ্যের সাবেক যুবরাজ অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসর, যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসন এবং সাবেক মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি ল্যারি সামার্স। এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তাদের প্রত্যেককেই ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে গুরুতর পরিণতির মুখে পড়তে হয়েছে।

এ ছাড়া মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কসহ আরও বেশ কয়েকজন ধনকুবের প্রকাশিত নথিতে নিজেদের নাম ও ইমেইল থাকার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হয়েছেন।

গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তার মতে এখন ‘দেশের অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে’।
তিনি আবারও দাবি করেন, ‘আমার সম্পর্কে কিছুই বের হয়নি।’

তবে নথির তথ্য পুরোপুরি সেই দাবিকে সমর্থন করে না। প্রকাশিত নথিতে ছয় হাজারেরও বেশি বার ট্রাম্পের নাম এসেছে। এপস্টেইন ও তার সহযোগীরা বিভিন্ন যোগাযোগে তাকে ঘন ঘন উল্লেখ করেছেন।

নিউইয়র্ক সিটি ও ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে বসবাসকারী এপস্টেইন ও ট্রাম্পের মধ্যে নব্বইয়ের দশকে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বলে নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের শুরুর দিকে গিয়ে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

২০১১ সালের একটি ইমেইল নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। ওই বছর এপস্টেইনের সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল দণ্ডিত হন। তাকে পাঠানো এক ইমেইলে এপস্টেইন লেখেন,
‘আমি চাই তুমি বুঝতে পারো যে নথিতে ট্রাম্পের নাম না থাকাটাই একটি সংকেত। (এক ভুক্তভোগী) তার সঙ্গে আমার বাড়িতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটালেও তার নাম একবারও আসেনি।’

সর্বশেষ প্রকাশিত নথিগুলোর মধ্যে এফবিআইয়ের যাচাই না করা কিছু তথ্যসূত্রের তালিকাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এতে ২০১৬ সালের কিছু অভিযোগ রয়েছে, যখন ট্রাম্প তার প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার মাঝপথে ছিলেন। ওই তালিকায় ট্রাম্প, এপস্টেইন ও আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগের উল্লেখ আছে।

তবে এসব অভিযোগের অধিকাংশের সঙ্গেই কোনো সহায়ক প্রমাণ ছিল না। শনিবার এসব তথ্য সাময়িকভাবে বিচার বিভাগের নথি–ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হলে সমালোচকদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়, প্রেসিডেন্টকে রক্ষায় বিচার বিভাগ সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

এ বিষয়ে বিচার বিভাগ জানায়, কিছু নথিতে ২০২০ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে এফবিআইয়ের কাছে জমা দেওয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ‘অসত্য ও চাঞ্চল্যকর’ অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিভাগটির দাবি, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা এবং বিশ্বাসযোগ্য হলে সেগুলো ইতিমধ্যে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

নতুন করে প্রকাশ পাওয়া ট্রাম্পের কিছু ছবি দীর্ঘদিন ধরেই জনসমক্ষে থাকা ছবি ও ভিডিওর বাইরে নতুন কিছু নয়। এ ছাড়া ইমেইল ব্যবহার এড়িয়ে চলার কারণে এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সরাসরি যোগাযোগের কোনো নথিভুক্ত প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো ২০০২ সালে এপস্টেইনের জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত একটি বইয়ে ট্রাম্পের নামে একটি অশালীন ও ইঙ্গিতপূর্ণ নোট থাকার অভিযোগ। তবে এটি সরকারের পক্ষ থেকে নয়, বরং এপস্টেইন এস্টেটের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ট্রাম্প ওই নোটের সত্যতা জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলেও এপস্টেইন কেলেঙ্কারি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও ক্ষমতাকাঠামোর ওপর দীর্ঘদিন ধরে ছায়া ফেলতে থাকবে। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়-এই অধ্যায় পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র আদৌ কতটা সামনে এগোতে পারবে?

বারিস্তা কফি,ফাস্ট ফুড এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রেনিং সেন্টার (বিএফএলটিসি)
Dr.Mahfuzul Alom