জাতীয়

বাকলিয়ায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে রণক্ষেত্র

অনলাইন ডেস্ক

১৩ ঘন্টা আগে


{news.title}

ছবি: সংগৃহীত


চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকায় তিন বছর বয়সী এক শিশু কন্যাকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার (২১ মে) বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযুক্ত যুবককে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষুব্ধ জনতা সড়ক অবরোধ, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলি ছুড়লে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বাকলিয়ার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকার আবু জাফর রোডে বিকেলে নিখোঁজ এক শিশুকে উদ্ধারের পর তার শারীরিক অবস্থা দেখে স্বজনদের সন্দেহ হয়, সে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। খবর দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

অভিযুক্তকে ঘিরে জনরোষ

স্থানীয়দের অভিযোগ, মনির নামের এক যুবক এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তিনি স্থানীয় একটি ডেকোরেশন দোকানে কাজ করতেন। এলাকাবাসীর দাবি, অভিযুক্ত তাদের কাছে নিজের অপরাধ স্বীকারও করেছেন। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ সংক্রান্ত তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বিকেল চারটার দিকে স্থানীয়রা অভিযুক্তের অবস্থান নিশ্চিত করে ‘বিসমিল্লাহ ম্যানশন’ নামে একটি ভবন ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে ভবনের কলাপসিবল গেট ভাঙার চেষ্টাও করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিশুটিকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠায় এবং অভিযুক্তকে হেফাজতে নেওয়ার চেষ্টা করে।

কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের পথরোধ করে অভিযুক্তকে নিজেদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়। উপস্থিত লোকজনের অনেকে “ধর্ষকের বিচার আমরা করব”-এমন স্লোগান দিতে থাকেন।

সংঘর্ষ, আগুন ও আতঙ্ক

সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। রাত আটটার দিকে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে স্থানীয়রা গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে বহদ্দারহাট-শাহ আমানত সেতু সড়ক অবরোধ করে। বিভিন্ন অলিগলি থেকে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়।

রাত ১১টার দিকে পুলিশ সদস্য বহনকারী একটি ট্রাকে আগুন দেওয়া হয়। সংঘর্ষে পুলিশ সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংবাদিকসহ কয়েকজন আহত হন। আহত সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন চট্টগ্রাম প্রতিদিনের দুই প্রতিবেদক এবং একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সংবাদকর্মী।

কৌশলে সরানো হয় অভিযুক্তকে

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়তে থাকলে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। একপর্যায়ে রাত ১১টার পর এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। সেই সুযোগে অভিযুক্তকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে কৌশলে ভবন থেকে বের করে বাকলিয়া থানায় নেওয়া হয়।

পুলিশ জানায়, বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বহু চেষ্টা করেও জনরোষের কারণে অভিযুক্তকে সরানো সম্ভব হয়নি। পরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাকে থানায় নেওয়া হয়।

বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, “আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। দেশে বিচারব্যবস্থা আছে। অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।”

সামাজিক ক্ষোভ ও বিচারহীনতার প্রশ্ন

ঘটনার পর এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের একটি বড় অংশের বক্তব্য, শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনায় দ্রুত বিচার না হওয়ায় মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের একের পর এক ঘটনায় জনমনে যে তীব্র ক্ষোভ জমেছে, বাকলিয়ার ঘটনা তারই বিস্ফোরিত বহিঃপ্রকাশ। তবে বিচারহীনতার ক্ষোভ থেকে জনতার আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নতুন উদ্বেগও তৈরি করছে।

তারা বলছেন, অপরাধ দমনে দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার যেমন জরুরি, তেমনি জনরোষকে সহিংসতায় রূপ নেওয়া থেকে ঠেকাতে কার্যকর সামাজিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগও প্রয়োজন।

Dr.Mahfuzul Alom