আন্তর্জাতিক

খামেনির পতন মানেই মুক্তি নয়: ইরানের সামনে কঠিন সময়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২ মাস আগে


{news.title}

ছবি: সংগৃহীত


ইরানে চলমান বিক্ষোভ আর কেবল অর্থনৈতিক অসন্তোষ কিংবা সামাজিক ক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।  শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাতে প্রায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি এই আন্দোলনকে সরাসরি শাসনব্যবস্থার বৈধতার প্রশ্নে পরিণত করেছে।  রাজপথে নেমে অসংখ্য ইরানি নাগরিক প্রকাশ্যে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাসনের অবসান দাবি করছেন।

অন্যদিকে খামেনি বিক্ষোভকারীদের ‘ধর্মদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। রাজপথ না ছাড়লে মৃত্যুদণ্ড অনিবার্য বলেও ঘোষণা এসেছে। তবে এসব হুমকি সত্ত্বেও আন্দোলন থামেনি। সশস্ত্র বাহিনী মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে প্রতিবাদকারীদের বিপক্ষে। রাষ্ট্রীয় অস্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে লাশের মিছিল নিয়েই এগিয়ে চলেছে পারস্যের প্রতিবাদী জনগণ।

এই সংকট হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর গত ৪৭ বছরে ইরানে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে, বর্তমান বিস্ফোরণ সেই দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে ক্রমাগত দুর্বল করেছে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে সাধারণ মানুষকে বছরের পর বছর সহ্য করতে হয়েছে কঠোর দমন-পীড়ন, নজরদারি ও ভয়ের শাসন।

‘বিপ্লব রক্ষার’ নামে শাসকগোষ্ঠী নাগরিক জীবনের ওপর সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে। নারীদের নাগরিক অধিকার ধারাবাহিকভাবে সংকুচিত হয়েছে। নৈতিক পুলিশের মাধ্যমে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। ভিন্নমত দমন করা হয়েছে ভয়, কারাবাস ও প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে। জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে।

এই চার দশকে ইরানি সমাজে জমে উঠেছে ক্ষোভ, হতাশা ও অপমানবোধ। বর্তমান বিক্ষোভ কোনো আকস্মিক আবেগ নয়; এটি একটি প্রজন্মব্যাপী চেপে রাখা ক্রোধের বিস্ফোরণ, যা আর শুধু শক্তি প্রদর্শন করে দমন করা যাচ্ছে না।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে-যদি খামেনি যুগের অবসান ঘটে, তাহলে ইরান কী ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে?

ইতিহাস বলে, কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন মানেই গণতন্ত্রের সূচনা নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে শাসনের পতনের পরের সময়টাই সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ক্ষমতার শূন্যতা, সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলায় প্রাণহানির সংখ্যা কখনো কখনো স্বৈরশাসনের সময়ের চেয়েও বেশি হয়।

ইরানের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি হলো ক্ষমতার শূন্যতা। দেশটির রাষ্ট্রকাঠামো অত্যন্ত কেন্দ্রনির্ভর। সেনাবাহিনী, বিপ্লবী গার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা ও আধা সামরিক বাহিনী সরাসরি খামেনির শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। হঠাৎ পতন ঘটলে দ্রুত কোনো বিশ্বাসযোগ্য অন্তর্বর্তী সরকার গড়ে না উঠলে নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতর থেকেই দ্বন্দ্ব শুরু হতে পারে।

কে আদেশ দেবে, কে মানবে-এই অনিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে অচল করে দিতে পারে। বিপ্লবী গার্ডের কোনো অংশ ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করতে পারে, আবার বাহিনীগুলো নিজেদের মধ্যেই বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে। এতে গণতন্ত্রের বদলে নতুন কোনো কর্তৃত্ববাদী বা অস্থিতিশীল ব্যবস্থার জন্মও হতে পারে।

ইরান বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশ। কুর্দি, বালুচ, আরবসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের অভিযোগ করে আসছে। কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হলে এসব অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন বা বিচ্ছিন্নতার দাবি জোরালো হতে পারে। এতে দেশ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা না থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সবচেয়ে সংবেদনশীল ঝুঁকিগুলোর একটি হলো পারমাণবিক নিরাপত্তা। শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দেবে। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে অভ্যন্তরীণ নাশকতা বা বিদেশি হামলার ঝুঁকি বাড়বে, যা গোটা অঞ্চলকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এ ছাড়া আঞ্চলিক অস্থিরতাও বড় ঝুঁকি। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর ইরানের প্রভাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হলে এসব নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় ফেলবে।

ইরান একটি বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি পরিবাহিত হয়। ইরানে বড় ধরনের অস্থিরতা মানেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর।

এর সঙ্গে যুক্ত হবে মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট। শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে প্রশাসনিক অচলাবস্থায় বেতন, ভর্তুকি ও সামাজিক সেবা ব্যাহত হতে পারে। ব্যাংকিং ব্যবস্থাও নড়বড়ে হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে, যা আবার ‘শক্ত হাতে শাসন’-এর আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলতে পারে।

ইরানের শাসকগোষ্ঠীর পতন দেশটির জনগণের জন্য যেমন গণতান্ত্রিক উত্তরণের ঐতিহাসিক সুযোগ, তেমনই তা ভয়াবহ বিপর্যয়ের ঝুঁকিও বহন করে। মূল প্রশ্ন শাসকের পতন নয়, বরং পতনের পর রাষ্ট্র কীভাবে নিজেকে সামাল দেয়। কারণ রাষ্ট্র যদি ভেঙে পড়ে, তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

বারিস্তা কফি,ফাস্ট ফুড এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রেনিং সেন্টার (বিএফএলটিসি)
Dr.Mahfuzul Alom