সারাদেশ

জঙ্গল সলিমপুরে সমন্বিত হামলা: গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রশ্নে চাপ বাড়ছে

অনলাইন ডেস্ক

২ ঘন্টা আগে


{news.title}

ছবি: সংগৃহীত


চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব ও পুলিশের দুটি অস্থায়ী ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং গোয়েন্দা তৎপরতার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। রোববার দিবাগত রাতে সংঘটিত এ হামলায় প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ সশস্ত্র সন্ত্রাসী অংশ নেয় বলে দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হামলার পর যৌথবাহিনীর অভিযান চললেও শেষ পর্যন্ত কোনো অস্ত্র উদ্ধার বা হামলার মূল নেতৃত্ব শনাক্ত না হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।

র‍্যাবের দাবি, কুখ্যাত ‘ইয়াসিন বাহিনী’ এ হামলার সঙ্গে জড়িত। তবে ঘটনার ধরন, পূর্বপ্রস্তুতি এবং হামলাকারীদের সংগঠিত কৌশল বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ছিল সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত আক্রমণ, যা আগাম গোয়েন্দা তথ্য ছাড়া প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল না।

হামলার আগে ছিল সুস্পষ্ট প্রস্তুতি

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, হামলার আগে রাতভর এস্কেভেটর ব্যবহার করে অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রাস্তা কেটে ফেলা হয়। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং ঘটনাস্থলে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন কর্মকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী তৎপরতা নয়; বরং এটি দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পিত অভিযানের ইঙ্গিত বহন করে।

র‍্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, রাত ১টার পর র‍্যাব ক্যাম্প লক্ষ্য করে হামলা শুরু হয় এবং একই সময়ে পাশের পুলিশ ক্যাম্পেও গুলিবর্ষণ করা হয়। তিনদিক থেকে গুলি চালানো এবং অবস্থান বদল করে আক্রমণের কৌশল হামলাকারীদের প্রশিক্ষিত ও সংগঠিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

গোয়েন্দা ব্যর্থতার তিন স্তর

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনায় অন্তত তিনটি স্তরে গোয়েন্দা ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়েছে।

প্রথমত, প্রাক-ঘটনা ব্যর্থতা।
রাতভর ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে রাস্তা কাটার মতো কর্মকাণ্ড স্থানীয় প্রশাসন বা গোয়েন্দা নজরদারির বাইরে থাকা প্রশ্নবিদ্ধ। এলাকাবাসীর দাবি, গভীর রাতেই পাহাড় কাটার শব্দ শোনা গিয়েছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকদিন ধরেই এলাকায় অপরিচিত ব্যক্তিদের আনাগোনা ছিল।

দ্বিতীয়ত, ঘটনার সময়ের ব্যর্থতা।
ক্যাম্পে হামলার আগে কোনো সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি। হামলা শুরু হওয়ার পরও সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সময় লেগেছে। এতে হামলাকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালানোর সুযোগ পেয়েছে।

তৃতীয়ত, ঘটনার পরবর্তী ব্যর্থতা।
ঘটনার ১৪ ঘণ্টা পরও কোনো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, কাউকে আটকও করা যায়নি। হামলাকারীদের পালানোর রুট শনাক্তে ব্যর্থতা গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

“এটি স্ট্র্যাটেজিক অ্যালার্টনেসের ঘাটতি”

পুলিশের সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, “এত বড় আকারে রাস্তা কাটা, ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং শতাধিক সশস্ত্র লোকের সমাবেশ স্থানীয় সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগে কোনো আভাস পেল না কেন?”

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, “এটি কোনো আকস্মিক হামলা নয়। পরিকল্পনা, বিকল্প রুট তৈরি এবং সমন্বিত আক্রমণ-সবই গেরিলা কৌশলের অংশ। এর একটিও আগে শনাক্ত না হওয়া উদ্বেগজনক।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. এম শাহীদুজ্জামান বলেন, “ত্রিমুখী সমন্বিত হামলা পরিচালনার জন্য আগাম মানচিত্র, যোগাযোগ ও নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির ফল।”

সলিমপুর: দীর্ঘদিনের অস্থিরতার কেন্দ্র

জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ দখল, পাহাড় কাটা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবের কারণে আলোচিত। সরকারি খাসজমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতি ও মার্কেট উচ্ছেদ এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সম্প্রতি সেখানে র‍্যাব ও পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, সেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই হামলাটি চালানো হয়েছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকাগুলোতে শুধু অভিযান নয়, স্থানীয়ভিত্তিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করাও জরুরি। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় এবং সংঘাত-সংবেদনশীল এলাকার ঝুঁকি বিশ্লেষণে ঘাটতি থাকলে ভবিষ্যতে এমন হামলা আরও বাড়তে পারে।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেছেন, হামলার আগে সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে রাস্তা কেটে ফেলেছিল। তিনি স্বীকার করেন, পাহাড়ি এলাকায় নজরদারি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

এ ঘটনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু অভিযান পরিচালনা নয়-দুর্গম অঞ্চলে টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর গোয়েন্দা কাঠামো ও স্থানীয় আস্থাভিত্তিক তথ্যসংগ্রহ ব্যবস্থার বিকল্প নেই।

Dr.Mahfuzul Alom